স্বামী স্ত্রীর রোমান্টিক ইসলামিক গল্প 2024

 স্বামী স্ত্রীর ইসলামিক স্ট্যাটাস

স্বামী স্ত্রীর ইসলামিক স্ট্যাটাস

❝ বাবা কোন পুরুষ যদি আমাকে দেখতে আসে তাহলে আমি কিন্তু কারো সামনে যাব না বলে দিলাম। এতে আমার বিয়ে হলে হবে নইলে হবে না,আমার কোন আফসোস নেই। আমি এভাবে নিজেকে দেখানোর জন্য সামনে যেতে পারব না। মেয়ে দেখতে আসলে কীভাবে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে তা তো সবাই জানো। মেয়ে মানুষ দেখুক সমস্যা নেই কিন্তু পুরুষ মানুষ কখনো না।❞


মেয়ে ইনশিয়া কথায় চিন্তায় পড়ে গেলেন বাবা বেলাল হোসেন। মেয়ে যে পর্দাশীল, মাহরাম-নন মাহরাম মেনে চলার চেষ্টা করে সেটা বাড়ির সবাই জানে আর তাকে এ ব্যাপারে সহযোগিতাও করে কিন্তু ছেলেপক্ষকে মুখের ওপর নিষেধ করবে কীভাবে সেটাই বুঝতে পারছে না। এদিকে ছেলের বাড়ি থেকে সবাই রওয়ানা দিয়ে দিয়েছে। ছেলের ফুপা, মা, ফুপু,বোন,ভাই,ভাবি মোট ছয়জন আসার কথা বলেছে। এইতো কিছুক্ষণ আগে জানালো তারা গাড়িতে আছে। বিষয়টা ইনশিয়া জানতো না, তাকে জানানোর পর সে বিষয়টা একেবারে নাকচ করে দিয়েছে। বেলাল সাহেব মেয়েকে খুব ভালোবাসেন, তিনি মেয়ের সব কথার হ্যাঁ তে হ্যাঁ আর না তে না মেলাতেই ব্যস্ত। তবে এই পরিস্থিতিতে কি করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না।

বেলাল সাহেবের ফোনটা বেজে ওঠে, হাতে নিতেই দেখে ছেলের(মুর্তাসিমের মা) মা কল দিয়েছে। রিসিভ করতেই কাউকে বাহিরের দিকে একটু এগিয়ে যেতে বলেন যেন বাড়ি চিনতে অসুবিধা না হয়।

বেলাল সাহেব মেয়েকে কিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে যান, তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে এক আকাশ পরিমাণ চিন্তা মাথায় অবস্থান করছে।


বিকেল পাঁচটা, সবার নাস্তা সম্পূর্ণ হয়েছে এখন মেয়ে দেখার অপেক্ষায় আছে। ইনশিয়া পাশের রুমে চুপচাপ বসে আছে। সে প্রায় কান্না করে দিয়েছে এটা ভেবে যে তার বাড়ির মানুষ এরকম কীভাবে করতে পারলো! আগে থেকে তাদের কেন নিষেধ করে দিলো না? 

ছেলের(মুর্তাসিম) বাড়ির সবাই বসে আছে। মুর্তাসিমের বোন ইনশিয়ার মাকে বলে, " আন্টি আর কতক্ষণ লাগবে? আমাদের তো আবার বাড়ি ফিরতে হবে। ইনশিয়াকে আসতে বলুন।"


" আচ্ছা আমি দেখছি মা, একটু অপেক্ষা করো।"


ইনশিয়ার মা, ইনশিয়ার বাবাকে নিয়ে মেয়ের রুমে যান। ইনশিয়া তখন বই নিয়ে বসে ছিল। তার মা এসে সামনে দাঁড়ায়। 


" তুই সত্যিই যাবি না মা?"


" না মা, আমি নিজেকে উন্মুক্ত করতে পুরুষের সামনে যেতে পারব না।"


" কি করব তাহলে বলে দে। "


ইনশিয়া এবার বইটা বন্ধ করে পাশেই রেখে দেয়। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভেবে বলে, " ওরনি আপুকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। উনিই তো মূলত উনার ভাইয়ের জন্য আমাকে পছন্দ করেছেন। আর উনি আমার কলেজ লাইফের সিনিয়র ছিলেন, উনি খুব ভালোভাবেই আমাকে চিনেন এবং জানেন। আমি আমার বিষয়টা উনাকে বললে উনি নিশ্চয়ই বুঝবেন।"


ইনশিয়ার মা, বেলাল সাহেবকে বাহিরের রুমে গিয়ে ওরনি অর্থাৎ মুর্তাসিমের ছোটবোনকে ডেকে নিয়ে আসতে বলে। বেলাল সাহেব আর দেরি না করে সেখানে গিয়ে ওরনিকে বিষয়টি জানায়। ওরনিও আর দেরি না করে তার বড় ভাবিকে নিয়ে দুজন মিলে ইনশিয়ার কাছে এসে দাঁড়ায়। ইনশিয়ার হাতে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বলে, " কি হয়েছে আপু?"


ইনশিয়া আমতা আমতা করে বলে," আসলে...."


" কিছু হয়েছে? নির্দ্বিধায় বলতে পারো তুমি। যাচ্ছো না কেন সবার সামনে?"


" আপু সোজাসাপটা কথাটা বলেই দিই, আপনি তো আমাকে যথেষ্ট চিনেন।"


" হ্যাঁ চিনি বলেই তো আমি তোমার কথাটা বাসায় বলেছি। তুমি আমার ভাইয়ার জন্য একদম মানানসই। "


" কিছু হয়েছে ইনশিয়া? বড়বোন ভেবে বলতে পারো।"


মুর্তাসিমের বড় ভাইয়ের বউয়ের কথা শুনে আর ওরনির কথা শুনে ভরসা পায় ইনশিয়া। তার মা এবার তাদের তিনজনকে রুমে রেখে বাহিরের রুমে যায়। ইনশিয়া একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে বলে,


" আসলে আপু মেয়ে কীভাবে দেখে সেটা সকলেরই জানা, অধিকারও আছে হয়তো বিয়ের আগে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার কিন্তু আপু আমি কোন পুরুষ মানুষের সামনে যেতে পারব না। বাহিরে আর যারা বসে আছেন মেয়েমানুষ তারা এসে আমাকে এখানে দেখতে পারেন যেভাবে ইচ্ছে কিন্তু আপু.........."


ওরনি বিষয়টা নিয়ে আগে ভাবে নি। সে নিজেও জানে ইনশিয়া এরকমই মেয়ে। আর তার ফুপু তো পুরো ব্যাকডেটেড মানুষ হাটাচলা থেকে শুরু করে চুল অবধি সব দেখবে। ইনশিয়া যেভাবে চলাচল করে অভ্যাস তার বিপরীতে তো যেতে বলতে পারে না তারা। 

মুর্তাসিমের বড়ভাবি বলে ওঠেন, " ইনশিয়া দুজন অভিভাবক হিসেবে এসেছেন আমার ফুপাশ্বশুর আর তোমার ভাইয়া। ওদের সামনে না গেলে বিষয়টা কেমন যেন দেখায় না? আর বিয়ের জন্য তো সামনে যাওয়াই যায়।"


" এটা অসম্মানজনক কাজ হবে কি না জানি না তবে আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না ভাবি, আমাকে বাবা আগে জানায় নি৷ বাবা জানালে এই অবস্থা হতো না।"


" আচ্ছা আচ্ছা আমি দেখছি বিষয়টা, ভাবি তুমি এখানেই বসো আমি আসছি।"


সেদিন ওরনি সবটা সামলে নিয়েছিল, তার বড় ভাই আর ফুপা বিষয়টাকে সম্মান জানিয়েছিল। এই বিষয়ে দ্বিমত করার সাহস তাদের হয়নি। মনে মনে বেশ আনন্দিত হয়েছিল এটা ভেবে যে এই একবিংশ শতাব্দীতেও এমন মেয়ে আছে!


ইনশিয়াকে দেখে আসার প্রায় দুই সপ্তাহ পর মুর্তাসিম আর ইনশিয়ার বিয়ে সম্পন্ন হয়। মুর্তাসিম এখনই বিয়ে করতে চাইছিল না কিন্তু সবার মেয়ে দেখে আসার পরের কথাবার্তা শুনে সে আর দেরি করতে চায় নি। এই মেয়েটাকে সে মনে মনে তার জীবনে একটা অন্যতম স্থান দিয়ে দিয়েছিল।


ইনশিয়া বউসাজে বাসরঘরে অপেক্ষা করছে। দ্বিতীয়বারের মতো নিজের স্বামীকে দেখার অপেক্ষায় আছে সে। কবুল বলার পর একমাত্র ব্যক্তিগত মানুষটার দিকে সে তাকিয়েছিল। এই একবার তাকানোতেই যেন যুগ যুগ পার করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল তার। একটা পুরুষ আসলেই এত সুন্দর হয়! এই সুন্দর মানুষটা কি তার ইচ্ছেপুরুষ হতে পারবে? নিজের ব্যক্তিগত মানুষটাকে নিয়ে সে যা যা ভেবেছে এই মানুষটা কি ওমন হবে! 

বিয়ের আসরে একবার দেখে এত মানুষের মাঝে আর একবার তাকিয়ে দেখার সাহস হয় নি তার। এখন বসে বসে বরের জন্য অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণ পরই দরজা খোলার শব্দ পেয়ে তাকাতেই দেখে মুর্তাসিম এগিয়ে আসছে। গায়ের সাদা পাঞ্জাবি পাজামাতে তাকে অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে, গালের ছোট চাপদাড়ি যেন সৌন্দর্য্য কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ব্যক্তি যেকোন মেয়ের স্বপ্নের পুরুষ হতে পারেন। 

মুর্তাসিম আর ইনশিয়ার দূরত্ব কমতেই মুর্তাসিমের গলার সালাম ভেসে আসে ইনশিয়ার কানে। সালামটা ইনশিয়ার দেবার কথা ছিল কিন্তু সুযোগটা সে পেল না।

মুর্তাসিম এসে ইনশিয়ার পাশে বসে। একপলকে নিজের কাঙ্ক্ষিত নারীকে নিরবে দেখে যাচ্ছে। ইনশিয়া মুর্তাসিমের ধ্যান ভাঙিয়ে বলে ওঠে, 


 " আপনার ফোনটা দেয়া যাবে? বাড়িতে একটু কথা বলতাম।"


মুর্তাসিম সাথে সাথে ফোনটা বের করে ইনশিয়ার সামনে ধরে। মুর্তাসিমের ফোনের ওয়ালপেপারে নিজের ছবি দেখে খানিকটা অবাক হয়।


" আমার ছবি এখানে!"


" হ্যাঁ ওরনি দিয়েছিল।"


" একটা সত্যি কথা কি জানেন আমি ভেবেছিলাম বিয়েটা ভেঙে যাবে তবে আফসোস ছিল না।!"


" ওরনি যখন বলেছিল সেদিনের ঘটনা আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এই হিরের টুকরোকে অন্য বাড়ি আলোকিত করতে আমি দিতেই পারি না৷ এই মেয়েটাকে আমার লাগবেই। অতএব এখন আপনি আমার ব্যক্তিগত মানুষ। আমার বিবিজান...."


ইনশিয়া কিছু না বলে চুপচাপ মুর্তাসিমের দিকে তাকিয়ে থাকে। মুর্তাসিম আবার বলে, " তোমাকে হেফাজতে রাখবেন আল্লাহ, আমি শুধু তোমাকে সাহায্য করব। আমি সেসব মানুষের মত নই যারা বউসহ ছবি তুলে ভার্চুয়ালে শেয়ার করে বা বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। তুমি যেভাবে থাকতে চাও আমি তোমাকে সেভাবেই রাখব ইন শা আল্লাহ। আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি ইনশিয়া। 


মুর্তাসিমের এই সামান্য কথায় ইনশিয়ার চোখ টলমল করতে থাকে। তার মানে এই ব্যক্তিগত মানুষটা আর ইচ্ছেপুরুষ! একদম তার মতই চিন্তাভাবনা, এরকম মানুষ আদৌ হয়! 

মুর্তাসিম আলতো করে ইনশিয়াকে বুকে জড়িয়ে নেয়, ইনশিয়াও নিশ্চিন্তে তার বুকে মাথা রাখে। মুর্তাসিম ইনশিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, " চলুন বিবিজান, না ঠামাজ পড়তে হবে না? অনেক রাত হয়ে গেল তো!"


প্রতিটা ভালোবাসা আল্লাহর জন্য হোক, মিশে যাক একে অপরের সাথে, লাভ হোক আল্লাহর সন্তুষ্টি। 


সমাপ্ত।

অনুগল্প


এমন আরও স্বামী স্ত্রীর ইসলামিক গল্প পড়ুন।