গল্প: “শেষ চিঠির পরে”
শহরের ব্যস্ত রাস্তার পাশে পুরোনো এক কাঠের বাড়ি। এই বাড়িটার দ্বিতীয় তলায় ছোট্ট একটা ঘর, সেখানে থাকত একজন মানুষ—রিয়াদ। বয়স পঁচিশের কাছাকাছি, একদম সাধারণ চেহারা, কিন্তু চোখে অদ্ভুত এক গভীরতা। যেন হাজারো না বলা কথা জমে আছে চোখ দুটিতে।
রিয়াদের জীবনটা অন্যদের মতো নয়। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হলেও, সে কখনো আদর-ভালোবাসা পায়নি। ছোট থেকেই বাবা ছিল রূঢ়, মা ছিলেন নিঃস্বরে মুখ বুজে সহ্য করা এক নারী। সংসারে শব্দের চেয়ে বেশি চলত নিরবতা। সেই নিরবতায় বড় হওয়া রিয়াদ বিশ্বাস করত—ভালোবাসা জিনিসটা হয়তো গল্পে থাকে।
তবে সে ভুল প্রমাণ করল একজন—মাইশা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে প্রথম দেখা। মাইশার চুল এলোমেলো, চোখে হালকা চশমা, আর মুখভরা হাসি। রিয়াদের মতো একজন চুপচাপ ছেলের ভেতরেও আলো ঢুকে পড়েছিল সেদিন। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। রিয়াদ কথা বলতে পারত না সহজে, কিন্তু মাইশার সামনে যেন তার ভেতরের পাহাড়ও গলে যেত।
সময় গড়াল। সেই বন্ধুত্ব প্রেমে রূপ নিল। প্রথমবার কেউ রিয়াদের হাত ধরল, তাকে বুঝতে চাইল, তাকে ভালোবাসল। রিয়াদ ভেবেছিল—এই মেয়েটাই তার ‘শেষ গন্তব্য’। সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করল, পরিবার, ঘর, সন্তান—সবকিছু।
কিন্তু ভালোবাসা মানেই কি শেষ পর্যন্ত পাওয়া?
মাইশার পরিবার কখনোই চায়নি সে রিয়াদকে ভালোবাসুক। তারা উচ্চবিত্ত, রিয়াদ ছিল মধ্যবিত্তের নিচু সীমানায়। একদিন, হঠাৎ করে মাইশা ফোন করল—“আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে রিয়াদ। আমি কিছুই করতে পারিনি…”
রিয়াদ শুধু চুপ করে ছিল। অনেকক্ষণ। তারপর শুধু বলল, “তুই ভালো থাকিস।” আর কিছু না।
এরপর ছয় মাস কেটে গেছে।
রিয়াদ এখন আর সেই রিয়াদ নেই। কারো সঙ্গে কথা বলে না, হাসে না, এমনকি নিজেকে আয়নাতেও দেখে না। তার একমাত্র কাজ—একটি চিঠি লেখা। প্রতিদিন সন্ধ্যায়, ছোট ছোট চিঠি, যেগুলো কেউ কখনো পাবে না। দেওয়ালের আলমারিতে লুকিয়ে রাখে সে সেগুলো। প্রতিটি চিঠির শেষ লাইনে লেখা—
“যদি কখনো ফিরে আসিস, আমি হয়তো থাকবো না—তবুও পড়ে নিস চিঠিগুলো।”
একদিন, জানালার পাশে বসে লেখা শেষ করে রিয়াদ হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। তারপর ছাদে উঠে যায়। আকাশে তখন মেঘ, বাতাস কাঁপে। রিয়াদ একবার চারপাশ দেখে। তারপর চোখ বন্ধ করে।
ঠিক সেই মুহূর্তে, বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল এক মেয়ে—মাইশা।
সে এসেছে, অনেক দেরিতে। বলবে, “আমি ভুল করেছি, তোমাকে ছাড়া বাঁচা যায় না…”
কিন্তু তখন ছাদের কিনারায় পড়ে আছে একটি পুরোনো খাম। তাতে লেখা,
“শেষ চিঠির পরে… আর কোনো শব্দ থাকেনা।”
