গল্প: “বুকের পাঁজরে আগুন” | বাবা মানে কি? বাস্তব গল্প

 গল্প: “বুকের পাঁজরে আগুন”

গল্প: “বুকের পাঁজরে আগুন”

চট্টগ্রামের এক গরিব পল্লী এলাকায় ছোট্ট একটা টিনের ঘর। ভাঙা চৌকি, একটা পুরনো ফ্যান আর ছিদ্রযুক্ত ছাদ—যেখান দিয়ে বৃষ্টিতে পানি পড়ে মাথার পাশে। সেখানে বাস করে সালাম উদ্দিন, বয়স প্রায় ৫৫, পেশায় একজন রিকশাচালক। দিনশেষে চোখ মুখ ধুলায় ভরা, গায়ে ঘাম আর ক্লান্তির গন্ধ, কিন্তু বুকভরা স্বপ্ন—তার একমাত্র ছেলে রায়হানের স্বপ্ন।

সালাম উদ্দিন নিজে ক্লাস ফোরের বেশি পড়তে পারেননি। ছোট বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন, সংসারের দায় মাথায় তুলে শহরে রিকশা চালাতে শুরু করেন। এরপর বিয়ে, আর একমাত্র ছেলে রায়হানের জন্ম। ছেলে বড় হতে লাগল, সালাম উদ্দিন দিনরাত রিকশা চালিয়ে তার পড়ার খরচ চালাতে লাগলেন।

রায়হান একটু বড় হতেই বলল,

“বাবা, তোমার গায়ে সব সময় ঘাম আর কষ্টের গন্ধ লাগে… আমার খুব খারাপ লাগে।”

বাবা হেসে বলেছিল,

“এই ঘামের গন্ধেই তো তুই স্কুলে যাচ্ছিস, মা’র হাতে ভাত আছে। ঘ্রাণ নে এই ঘামের—এটাই তোর ভালো ভবিষ্যতের গন্ধ।”

রায়হান তখন বুঝতে পারেনি।

একদিন স্কুলে টিচার তাকে বললেন,

“তোমার বাবা তো রিকশাচালক, হ্যাঁ? তাহলে তুমি এত ভালো রেজাল্ট করো কী করে?”

সে লজ্জায় মাথা নিচু করে বলেছিল,

“আমার বাবা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্কুলে পড়ে—জীবনের স্কুলে। উনি ক্লাস পাস না করলেও জীবনের সব ক্লাস উনি পাস করেছেন।”

এক সন্ধ্যায় রায়হান বলেছিল,

“বাবা, আমার একটা স্মার্টফোন লাগবে, ক্লাসে স্যার অনেক কিছু অনলাইনে শিখায়।”

বাড়ি ফিরেই সালাম উদ্দিন নিজের পুরনো মোবাইলটা বিক্রি করে দিলেন। তারপর এক সপ্তাহ খেয়ে না খেয়ে রিকশা চালালেন, রাতে ঘুমালেন না। সপ্তম দিন কিনে আনলেন একটা পুরনো অ্যান্ড্রয়েড ফোন।

ছেলেকে ফোনটা দিয়ে বললেন,

“নিয়ে নে, তোর হাতেই আমার ভবিষ্যৎ। বই ছাড়া কিছু দেখবি না, বুঝলি?”

ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিল।

তবে একদিন বিপদ এলো।

সালাম উদ্দিনের শরীরে জ্বর এলো, পরে ধরা পড়ল টাইফয়েড আর ব্লাডপ্রেশার বেড়ে গেছে। ডাক্তার বলল,

“এক মাস বিশ্রাম নিতে হবে।”

তখন রায়হান নিজেই রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। স্কুলের ইউনিফর্ম খুলে যখন সে বাবার পুরনো হাফ প্যান্ট পরে রিকশা চালাতে গেল, তখন তার চোখে বাবার ঘামের আসল মানে ফুটে উঠল।

একজন যাত্রী তাকে দেখে বলল,

“ছোট ছেলে রিকশা চালাচ্ছে? বুড়ো বাবা কোথায়?”

রায়হান হাসল,

“বাবা এখন ঘুমোচ্ছে। এখন আমি চালাবো, কারণ আমি এখন বুঝেছি, বাবা মানে কী—একটা ছায়া, যে রোদে পুড়ে যায়, তবু সন্তানকে রোদে যেতে দেয় না।”

একদিন সে বাড়ি ফিরে দেখে, বাবা উঠানে বসে তার জন্য অপেক্ষা করছে। চোখে জল, মুখে হাসি।

“আজ তুই রিকশা চালালি? কেমন লাগল?”

রায়হান চুপ করে বসে পড়ে বাবার পায়ের কাছে।

“বাবা, আমি জানতাম না, পাঁজরের নিচে এত ব্যথা হয়, যখন কেউ না খেয়ে সারাদিন কষ্ট করে। আমি জানতাম না, তুমি প্রতিদিন তোমার জীবনটা বিক্রি করো, আমার ভবিষ্যতের দামে।”

সালাম উদ্দিন মাথায় হাত রেখে বললেন,

“এই ব্যথা যদি তোকে মানুষ বানায়, তাহলে আমার সব ব্যথা কবুল।”

সময় গড়ায়। রায়হান এখন একটি সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়ে। বাবা আগের মতোই টিনের ঘরে থাকেন, কিন্তু এখন তার মাথার ছাদ সিমেন্টের। ছেলে চায় বড় ফ্ল্যাটে নিয়ে যেতে, কিন্তু বাবা বলেন,

“এই ঘরের ভেতর তোর প্রথম কান্না, প্রথম পা ফেলা, আর আমার রিকশা চালানোর প্রতিটা রাত। আমি এখানেই থাকবো। শুধু চাই, তুই বাবা হ যা—আমার মতো। কিন্তু তোর ছেলেকে রিকশা না চালাতে হয়।”

রায়হান একদিন এক বন্ধুকে বলেছিল,

“তুই জানিস? বাবা মানে শুধু একজন মানুষ না—একটা জীবনযুদ্ধ, একটা নিঃস্বার্থতা, একটা ‘আমি আছি তোর জন্য’ নামের আশ্রয়।”

Disclaimer / Story Policy

This story is entirely fictional. Any resemblance to actual events, characters, places, or times is purely coincidental. The primary purpose of our stories is to entertain readers and present various social or emotional perspectives.

We do not intend to provoke anyone, incite violence, or cause defamation in any way. Every individual and culture is different, and we deeply respect that. Our stories are not meant to hurt anyone’s feelings or beliefs.

If any part of the story resembles your personal life, it is completely unintentional and coincidental. We do not hold responsibility for such similarities.

"এই গল্পটি ‘জীবন যুদ্ধ গল্প.কম’ ওয়েবসাইটের নিজস্ব প্রকাশনা। আমাদের অনুমতি ছাড়া এই গল্প বা এর কোনো অংশ অন্য কোথাও প্রকাশ, অনুলিপি বা ব্যবহার করা যাবে না। প্রয়োজনে ব্যবহার করতে চাইলে, অনুগ্রহ করে আমাদের সঙ্গে আগে যোগাযোগ করুন।" Jibonjuddhogolpo@gmail.com